তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বিষয়ে ৬৪টি জেলায় এবং ১৮টি উপজেলায় জনঅবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে ৪৬টি জেলায় এবং ১৬টি উপজেলায় সর্বমোট ১২০২১ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংবাদিক, শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ সংবিধানে তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে স্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা নেই তবুও সংবিধানের ৯, ৩২ এবং ৩৯ ধারাকে তথ্য অধিকার আইনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমান নিবন্ধ তৈরি করা হয়েছে একজন কমিশনার হিসেবে দেশের ৩০টি জেলা সফর ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা থেকে। তথ্য কমিশনের গুরম্নত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে মৌলিক কাজ হলো অভিযোগ গ্রহণ এবং তথ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কোন আবেদনকারী তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আপিল কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বঞ্চিত হলে এবং কমিশনে অভিযোগ করলে আবেদনকারীর তথ্যপ্রাপ্তিকে নিশ্চিত করার সব প্রয়াস কমিশন নিয়ে চলছে। তথ্য অধিকার আইন চর্চার জন্য আছে আবেদনকারী ও সরবরাহকারী। এ দুটি দলই যে কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। যেমন ভারতে সরকারি কর্মকর্তারা তথ্য সরবরাহের জন্য বিশেষভাবে গুরম্নত্বপূর্ণ, তারাই সবচেয়ে বেশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে তথ্যের জন্য আবেদন করেছেন। বাংলাদেশে তথ্যের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা এখনো আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। এর প্রধান কারণ এই আইনটি সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা এবং আগ্রহের অভাব। তথ্য কমিশন এই লক্ষ্যে ২০০৯-এর জুলাই থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। দেশব্যাপী ৫১টি জেলায় জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় জনঅবহিতকরণ সভা করা হয়। সাধারণত গড়ে ওই সব সভায় ২০০ জন উপস্থিত থাকেন। কিন্তু পরবর্তীতে এসব সভার কোনো প্রভাব পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সরকারি/বেসরকারি উদ্যোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সব দায়দায়িত্ব আবকাঠামোগত দুর্বলতা বা জনবল সীমিত এসবের দোহাই না দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উদ্যোগ নিয়ে এ আইনচর্চায় আবেদনকারী সৃষ্টি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মমত্মব্য উলেস্নখ করা প্রয়োজন। তিনি তথ্য কমিশনের ‘তথ্য বাতায়ন’ উদ্ধোধনকল্পে বলেন, তথ্য অধিকার দরিদ্র, প্রামিত্মক এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। ২০০৯ সালে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিসেম্বর, ২০১১ পর্যমত্ম সর্বমোট ১০৪টি অভিযোগ তথ্য কমিশনে করা হয়। তথ্য কমিশনে বিভিন্ন সভায় এসব অভিযোগ পর্যায়ক্রমে আইন মোতাবেক করা হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষার মাধ্যমে আমলে নেওয়া হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন দিবসে শুনানির মাধ্যমে আজ পর্যমত্ম ৪৪টি অভিযোগ নিষ্পন্ন করা হয়েছে। যেসব অভিযোগ ত্রম্নটিপূর্ণ বিবেচনায় খারিজ বা স্থগিত করা হয় তা ক্ষেত্রবিশেষে তথ্য কমিশন কর্তৃক আবেদনকারীকে আইন মোতাবেক পুনরায় অভিযোগ করার জন্য জানানো হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় তথ্য কমিশনের জনবান্ধব ধারাটিই প্রতিফলিত হচ্ছে।

তথ্য অধিকার জনগণের মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। এ আইনের

তথ্য কমিশনের দাখিলকৃত অভিযোগুলোর সিংহভাগই এসেছে প্রামিত্মক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যারা মূলত রিইব, নাগরিক উদ্যোগ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রভৃতি এনজিওর সহযোগিতায় অভিযোগ পেশ করে। এছাড়া রয়েছেন সাংবাদিক, অ্যাডভোকেট, পরিবেশকর্মী, এনজিওকর্মী, ছাত্র, চাকরিচ্যুত কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন। অন্যদিকে ব্যক্তিগত উগ্যোগে অভিযোগের সংখ্যা এখনো সীমিত। বিশেষ করে দরিদ্র জনগণ নিজস্ব উদ্যোগে এ আইনের সুফল ভোগ করতে এখনো পারছেন না। বাংলাদেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ক্ষমতাযন্ত্রগুলো যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় এবং সংসদ সদস্যরা তাদের ধরাছোঁয়ার উর্ধ্বে। তাই তারা অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিঃসঙ্গ এবং মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখানে উলেস্নখ্য, ইউনিয়ন পরিষদ আইনে অমত্মর্ভুক্ত ছিল না কিন্তু বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ করে তথ্য প্রদানের অন্যতম ইউনিট হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। প্রায় দুই বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও দেশের জনসাধারণের এখনো তথ্য অধিকার আইন কী, কীভাবে এ আইনের ব্যবহার/প্রয়োগ করা যায়, তথ্য না পেয়ে বঞ্চিত হলে কোথায় আপিল ও অভিযোগ করতে হয়- এসব গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়। যদিও তথ্য কমিশন MoU এর মাধ্যমে গ্রামীণ/রবির ২৬,৮৮,০৮,০০৭টি SMS text করেছে। ভবিষ্যতে বাংলায় মুঠোফোন বার্তা দিলে তথ্য আইনের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে আনুমানিক চার শতাংশ মানুষের ইন্টারনেট-সুবিধা আছে। অথচ ভারতে রয়েছে ১০ শতাংশ এবং পাকিসত্মানে সাত শতাংশ। এই বাসত্মবতার নিরিখে তথ্য কমিশন, তথ্য মন্ত্রণায়ল এবং দেশি-বিদেশি এনজিও সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন, রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র, প্রকাশনা, নাগরিক সনদ, বিলর্বোড, পথনাটক, উঠান বৈঠক ইত্যাদি মাধ্যমে বড় পরিসরে সচেতনতামূলক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কিছু বেসরকারি সংগঠন গণসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে কিন্তু সেটাও সীমিত। প্রামিত্মক মানুষের দ্বারে তথ্য অধিকার আইন প্রচারে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ধারণা নেই। ফলে মৌখিক আবেদনকে তারা তথ্য আবেদন হিসেবে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য আইনের নির্ধারিত ফরম্যাটের সঙ্গে মৌখিক আবেদনের পার্থক্য করতে না পারায় মৌখিকভাবে তথ্য প্রদানকেই তথ্য আইনের আওতাভুক্ত হিসেবে ধরে নেন। তথ্য কমিশনের পক্ষ থেকে এসব বিভ্রামিত্ম দূরীকরণের প্রচেষ্টা চলছে। তথ্য অধিকার বিধিমালায় নির্ধারিত ফরম ব্যবহার না করা হলেও মৌখিকভাবে তথ্যপ্রাপ্তির আবেদনের হার তথ্য জানার জন্য জনগণের আকাঙ্খারই প্রতিফলন।

তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা একটি গুরম্নত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তথ্য কমিশন স্বয়ং এবং বেসরকারি সংগঠন Article-19 এর সহযোগিতায় দুই হাজার ৫৯১ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্যের উপযুক্ত সরবরাহকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচী অব্যাহত আছে। যৌথ প্রশিক্ষণে তারা আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। প্রশিক্ষণে লক্ষণীয় যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আইন সম্পর্কে জানেন না এবং যেহেতু সরকারি চাকরিজীবীদের প্রায়ই বদলি হতে হয় এবং বিকল্প দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগেরও উদ্যোগ নেই বা যিনি স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি আইন সম্পর্কে অবহিত নন। দাফতরিক ও কিছু আইনের ধারাগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মানস কাঠামো পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে অনেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অপারগতা প্রকাশ করছেন বা ধারা ৭ অনুযায়ী যে ২০টি বিষয়ে সরকার তথ্য দিতে বাধ্য নয়, তার মধ্যে আবেদনটি না পড়লেও ধারা ৭-কে কৌশলে ব্যবহার করছেন। উপরন্তু অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ এর ৫[১] অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যের যৌক্তিকভাবে যত্ন নিতে হয় এবং তথ্য যদি বিনিময় করে তাহলে ওই কর্মকর্তা ধারা মোতাবেক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। এছাড়া ১৯৭৯/১৯৯৬ বিজনেস রম্নল্স-এ আরও কিছু আইনের ধারাগুলো তথ্য সরবরাহে তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী তথ্যের জন্য আবেদন করলে তথ্য অধিকার আইনটিই প্রাধান্য পাবে। প্রয়োজন হলো যেসব আইনের বিশেষ ধারাগুলো তথ্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলো অতিসত্বর বাতিল করা। বর্তমান আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও তথ্য কমিশনের এক মতবিনিময় সভায় যেসব আইনের বিভিন্ন ধারা তথ্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলো সংশোধনের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া তথ্য না দিলে কেবল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জরিমানা করার বিধান তথ্য আইনে আছে আপিল কর্তৃপক্ষকে নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণে প্রায়ই উলেস্নখ করেন যে অনেক ক্ষেত্রে আপিল কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ তাদের উর্ধ্বতন-কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহে নিরম্নৎসাহিত করেন। এ ক্ষেত্রে যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন [ACR] লিখেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজেই তথ্য প্রদানে দায়িতবপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নার্ভাস হয়ে যান। তথ্য অধিকার আইনে তথ্য কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যাবলির মধ্যে উলেস্নখ আছে যে ক্ষেত্রবিশেষে কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রদানে উদ্যোগী না হলে কমিশন আবেদকারীকে তথ্য আদায়ে Code of Civil Procedure 1908 অনুযায়ী সহযোগিতা করতে পারবে। অনেক শুনানিতে তথ্য কমিশন আপিল কর্তৃপক্ষকেও সমনে হাজির করেছে। তাই আপিল কর্তৃপক্ষকে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ সম্পর্কে অবগত হতে হবে যেন তার/তাদের গাফিলতির কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জরিমানার শিকার না হন।

সম্প্রতি তথ্য কমিশন একটি রায় দিয়ে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জরিমানা করে। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা হাইকোর্টে রিট করলে সেটা খারিজ হয়ে যায়। সুধীসমাজ এবং গণমাধ্যম তথ্য কমিশনকে এই রায় দেওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। তথ্য অধিকার আইনটি সবার জন্য উপযোগী হতে হবে। কমিশন আইনটি Centre for Disability in Development [CDD] এর সহায়তায় ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করতে যাচ্ছে, যা তথ্য অধিকার আইনের প্রচার ও প্রসারের একটি যুগামত্মকারী পদক্ষেপ। নারীদের তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন এবং একই সঙ্গে দেশের ক্ষুদ্র জনজাতিরাও যেন আইনটি সহজে ব্যবহার করতে পারে সে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ বাসত্মবায়নে জনপ্রতিনিধিদের সমর্থন বিশেষভাবে কাম্য।


* W. mv‡`Kv nvwjg

লেখক: তথ্য কমিশনার

 

Who's Online

We have 61 guests online

Photo Gallery

3rd RTI Tra...
Image Download
  
 

Video Gallery

 
RTI movie

Notice Board

Submission Code for Price of Information

Article Rating: / 0
(13087)
Read more...