তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বিষয়ে ৬৪টি জেলায় এবং ১৯টি উপজেলায় জনঅবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে ৬৩ টি জেলায় এবং ৫১টি উপজেলায় সর্বমোট ১৬১০১ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংবাদিক, শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

ড. সাদেকা হালিম

 

তথ্য অধিকার আইন
সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র

তথ্য অধিকার আইন

নাগরিকের ক্ষমতায়নের সঙ্গে জড়িত

এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র ও এর অঙ্গসংগঠন,

রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব, প্রশাসন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে

তথ্য অধিকার মানবাধিকারের অত্মর্ভুক্ত। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বহু রাষ্ট্রে ‘তথ্য অধিকার আইন’ আছে। জনগণের তথ্য অধিকার, সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে¨ সংবিধানের মৌলিক অধিকাররূপে স্বীকৃত চিত্মা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে সুনিশ্চিত করার ক্ষে¨ ৫ এপ্রিল, ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন বাংলাদেশ গেজেট প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়।

তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের ক্ষমতায়নের সঙ্গে জড়িত এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র এবং এর অঙ্গসংগঠন, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে। ওই আইনের ধারা-৪ এ উলেস্নখ আছে, ‘প্রত্যেক নাগারিকের কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষেও একজন নাগরিককে তথ্য প্রদানে বাধ্য থাকিবে’। সুতরাং এই আইন ক্ষমতাবানদের উপর তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। আবেদনকারীর আইনগত ভিত্তি (ধারা-৯) হচ্ছে তথ্য প্রদানে অনীহা আইনের লঙ্ঘন এবং তথ্য প্রার্থী আইনি প্রতিকার নিতে পারে। এই বক্তব্য তুলে ধরে যে তথ্য জনগণের, সরকারের নয়। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। জনগণের রায়ে সরকার নির্বাচিত হয় এবং জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় সরকার চলে। তাই জনগণের চাহিদাকৃত তথ্য দিতে সরকার বাধ্য।

এ ছাড়া গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়, তথ্যের অবাধ সরবরাহের সঙ্গে দুর্নীতি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরনস্বরুপ দুর্নীতির ধারণা সূচকের ভিত্তিতে দেখা যায়, যেসব দেশ (বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মধ্যে  ফিনল্যান্ড) তথ্য অধিকার আইন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, তারাই সর্বনিমণ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। যদিও সিঙ্গাপুর এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তথ্য অধিকার আইন ছাড়াই কম দুর্নীতিগ্রগ্রস্ত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা দুর্নীতির  ধারণাসূচক এবং  তথ্য অধিকারের মধ্যকার চূরান্ত সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করে। বস্ত্তত দুর্নীতি এবং তথ্য অধিকারকে সুনির্দিষ্টভাবে সম্পর্কিত করা যায় না, কারণ তা অন্যান্য আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সর্বময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তথ্য অধিকার আইন বাসত্মবায়নে বর্তমানে বেশ কিছু বেসরকারি সংগঠন কাজ করছে। পাশাপাশি তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। তথ্য কমিশন সীমিত জনবল নিয়ে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কিত সচেতনতায় বিভিন্ন ফোরামে ডায়ালগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডেটাবেইস তৈরি, ওয়েবপোর্টাল হালনাগাদকরণ এবং নিয়মিত প্রকাশনা সংক্রাত্ম কাজ করছে। এ ব্যতীত তথ্য কমিশন প্রাপ্ত অভিযোগপত্রগুলো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৩৩ টি জেলায় তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন জনঅবহিতকরণ করেছে।

তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুসংহত করার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ হচ্ছে তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য কমিশনের তথ্য বাতায়ন উদ্বোধনকালে বলেন, তথ্য অধিকার দরিদ্র, প্রান্তিক এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। তিনি বিশেষ করে এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উপর গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষে¨ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘এখন সবকিছুই তথ্য প্রাপ্তির উপর নির্ভর করে, সুতরাং আমাদের প্রথমেই তথ্য অধিকার কি এবং কিভাবে তথ্য অধিকার জনগণের উপকারে আসবে তা তাদের জানাতে হবে।

উলেস্নখ্য, বাংলাদেশে ৭০-৮০ শতাংশ লোক তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয় এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা নিঃসঙ্গ। সমাজের সর্বসত্মরে তথ্য অধিকার এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশ যেমনঃ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় অধিকাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কিভাবে তাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া যায়। এখানে স্মরণ রাখতে হবে, বাংলাদেশে অধিকাংশ লোকের ইন্টারনেটে প্রবেশগম্যতা নেই। বাংলাদেশে আনুমানিক ৪ শতাংশ লোকের ইন্টারনেট সুবিধা আছে যেখানে ভারতে ১০ শতাংশ এবং পাকিস্থানে ৭ শতাংশ। এই বাসত্মবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্বাক্ষরতার কথা বিবেচনায় তথ্য কমিশনকে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন-রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র প্রকাশনা, নাগরিক সনদ, বিলবোর্ড, জনপ্রিয় থিয়েটারের মাধ্যমে আরো বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক ভুমিকা নিতে হবে। সম্প্রতি রবি মোবাইল নেটওয়ার্কের সাথে তথ্য কমিশনের সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে রবি তাদের গ্রাহকদের বিনা মূল্যে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলও স্ক্রলের মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অবহিত করছে। ভবিষ্যতে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে জনগণ তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারে আগ্রহী হবে।

 

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে গণমাধ্যম এখন পর্যন্ত আশানুরূপ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য বিদ্যমান তথ্য তৈরিতে এবং এ আইনের প্রয়োজনীতা সৃষ্টিতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে, কিন্তু সেটাও সীমিত আকারে। সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণকে তথ্য অধিকার আইনের উপযোগীতা সম্পর্কে অবহিত করা।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ডিজিটাল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর্থিক এবং মৌল মানবিক চাহিদা পূরণে এ দুটি আইন মূল অনুঘটক। আঞ্চলিক ই-উন্নয়নের মাধ্যমে ই-গভর্ন্যান্সের কাঠামো সৃষ্টির লক্ষে¨ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পরিপ্রেক্ষিতে এ দুটি আইনের সমন্বয় সাধন জরুরি। সম্প্রতি সরকার ৪৫০১ ইউনিয়নে ই-গভর্ন্যান্স চালু করেছে। এই ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইনের উপযোগিতা সংক্রাত্ম তথ্য সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। তথ্য অধিকারের অনুশীলন এবং ব্যবহারসহ এ অঞ্চলের ই-গভর্ন্যান্স রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়নে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী ভিত্তি দান করতে পারে। তথ্য অধিকারকে একটি কৌশলগত এবং নির্দিষ্ট সময় ছকে বেঁধে দেওয়া দরকার। জনগণের উপর তথ্য অধিকার আইনের বাসত্মবায়ন এবং প্রভাব নিয়ে গবেষণা অতীব প্রয়োজনীয়।

তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে এসব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকারি এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোকে ভেতর ও বাইরে জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে তথ্য কমিশন অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সব নাগরিক সমাজ ও সংগঠন তাদের নিজেদের মধ্যকার অশোভনীয় প্রতিযোগীতা ও অনৈক্যের কারণে কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হতে পারে। তথ্য অধিকার আইনের উন্মক্ততার কারণে সরকারি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে তথ্য অধিকারকে দমিয়ে রাখার ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার অযাচিত ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় আইনের ব্যবহারকে কার্যকর করতে হবে। চূড়ামত্মভাবে আমরা বাংলাদেশে তথ্য কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন তথ্য কমিশন হিসেবে দেখতে চাই, যা সর্বাত্মক সমর্থন নিয়ে জনগণের তথ্যের অধিকার বাসত্মবায়নে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। (সংক্ষেপিত)

লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (বর্তমানে প্রেষণে তথ্য কমিশনার, তথ্য কমিশন)।

 

 

Who's Online

We have 87 guests online

Photo Gallery

Facilitatin...
Image Download
  
 

Video Gallery

 
RTI movie

Notice Board

GRS Focal Point

Article Rating: / 0
(708)
Read more...

Submission Code for Price of Information

Article Rating: / 0
(19153)
Read more...

Visitors Counter

mod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_countermod_vvisit_counter
mod_vvisit_counterToday2532
mod_vvisit_counterYesterday2462
mod_vvisit_counterThis week19325
mod_vvisit_counterLast week30298
mod_vvisit_counterThis month140211
mod_vvisit_counterLast month242949
mod_vvisit_counterAll days750507

We have: 24 guests, 63 bots online
Your IP: 54.167.177.140
 , 
Today: Mar 27, 2015